ডেস্ক নিউজ : প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়বিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেছেন, নীতিনির্ধারণ, গবেষণা ও সরকারি সেবা কার্যক্রমে নির্ভরযোগ্য তথ্য নিশ্চিত করতে দেশের পরিসংখ্যান ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ ব্যবস্থাকে আন্তর্জাতিক মানের, বিজ্ঞানভিত্তিক ও সবার জন্য সহজলভ্য করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, গত ১৭ বছরে এমন অনেক পরিসংখ্যান দেখা গেছে, যা দেশের প্রকৃত পরিস্থিতির প্রতিফলন ঘটায়নি। সরকার এখন এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায়, যেখানে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে তথ্য সংগ্রহ করা হবে এবং দেশের প্রকৃত চিত্র উঠে আসবে। রাজধানীর বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) মিলনায়তনে জাতীয় পরিসংখ্যান দিবস-২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
‘নির্ভরযোগ্য ও সহজলভ্য পরিসংখ্যান : টেকসই উন্নয়ন ও পরিকল্পনার ভিত্তি’ প্রতিপাদ্যে পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগ এবং বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) যৌথভাবে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন।
বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি জহির উদ্দিন স্বপন এবং পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি।
পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব মো. ফিরোজ সরকারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন বিবিএসের মহাপরিচালক মো. শামীমুল হক। জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বিষয়ে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিবিএসের পরিচালক কবির উদ্দিন আহাম্মদ।
আলোচনায় অংশ নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান সমিতির সভাপতি সৈয়দ শাহাদাত হোসেন এবং বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক ড. এ কে এনামুল হক।
ড. তিতুমীর বলেন, পরিসংখ্যান ব্যবস্থার সংস্কারে সরকার তিনটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দিয়েছে। এগুলো হলো মানসম্মত ও আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য পরিসংখ্যান নিশ্চিত করা, তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে জননীতি ও সরকারি সেবা কার্যক্রম জোরদার করা এবং উন্মুক্ত তথ্যনীতি চালুর মাধ্যমে সরকারি তথ্য সহজলভ্য করা।
মানসম্মত পরিসংখ্যানের গুরুত্ব তুলে ধরে উপদেষ্টা বলেন, দেশে তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা ও আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করতে স্বীকৃত বৈশ্বিক মান অনুসরণ করতে হবে। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে মানসম্মত পরিসংখ্যান তৈরির কাজ চলছে। অতীতের তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করে বিভিন্ন অসংগতি ও ঘাটতি চিহ্নিত করা হয়েছে।
মোট দেশজ উৎপাদনসহ (জিডিপি) গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সূচকের তথ্য পর্যালোচনার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশের অর্থনীতির প্রকৃত চিত্র যেন পরিসংখ্যানে উঠে আসে, সরকার তা নিশ্চিত করতে চায়।
মাঠ পর্যায়ে তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতিও আধুনিকায়ন করা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে ভূস্থানিক তথ্যপ্রযুক্তি ও কম্পিউটার-সহায়তায় ব্যক্তিগত সাক্ষাৎকার (ক্যাপি) পদ্ধতি ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহকারীদের অবস্থান যাচাই এবং পরিবারভিত্তিক তথ্যের নির্ভুলতা বাড়ানো সম্ভব হবে।
তিতুমীর বলেন, ‘পরিসংখ্যান তৈরি বা বানানো যাবে না, তা সংগ্রহ করতে হবে।’ তথ্য সংগ্রহে স্বচ্ছতা ও পদ্ধতিগত শুদ্ধতা বজায় রাখার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
অতীতের পরিসংখ্যানের অসংগতির উদাহরণ দিয়ে উপদেষ্টা বলেন, দেশে ইঞ্জিনচালিত নৌকার সংখ্যা একসময় সরকারি হিসাবে প্রায় ১৩ হাজার দেখানো হয়েছিল। অথচ প্রকৃত সংখ্যা ছিল প্রায় ২ লাখ ৬৭ হাজার।
সংস্কারের দ্বিতীয় ক্ষেত্র সম্পর্কে তিনি বলেন, সরকারি নীতিনির্ধারণ ও সেবা কার্যক্রম তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে পরিচালনা করতে চায় সরকার। বিশেষ করে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে উপকারভোগী নির্বাচনের ক্ষেত্রে যোগ্য ব্যক্তিকে বাদ দেওয়া এবং অযোগ্য ব্যক্তিকে অন্তর্ভুক্ত করার মতো ভুলের কারণে সীমিত সরকারি সম্পদের সঠিক ব্যবহার ব্যাহত হয়েছে।
প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে সরকারি সহায়তা পৌঁছে দিতে প্রক্সি মিনস টেস্টসহ (পিএমটি) বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি চালু করা হচ্ছে বলে জানান তিনি। ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির কথা উল্লেখ করে তিতুমীর বলেন, যোগ্য নারীরা যাতে এ কর্মসূচির সুবিধা পান, সে জন্য বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে উপকারভোগী নির্বাচনের ব্যবস্থা গড়ে তোলা হচ্ছে।
সরকার বিভিন্ন দপ্তরের তথ্যভান্ডারের মধ্যে সমন্বয় প্রতিষ্ঠায় ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার (ডিপিআই) গড়ে তোলার কাজও করছে। এর আওতায় জনসংখ্যা নিবন্ধন, জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন এবং জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) তথ্যভান্ডার পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত করা হবে। এতে সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান আরও সহজ হবে।
সংস্কারের তৃতীয় ক্ষেত্র সম্পর্কে উপদেষ্টা বলেন, সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে সরকার একটি উন্মুক্ত তথ্যনীতি চালুর পরিকল্পনা করছে।
তিনি বলেন, গবেষক, বিশ্ববিদ্যালয় এবং দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠান যেন নির্ভরযোগ্য তথ্য সহজে ব্যবহার করতে পারে, সরকার তা নিশ্চিত করতে চায়। সরকারি পরিসংখ্যান সহজলভ্য হলে একাডেমিক গবেষণার পরিধি বাড়বে, বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার মান উন্নত হবে এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি জোরদার হবে।
দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি সম্পর্কে অপতথ্য ও ভুল ব্যাখ্যা মোকাবিলায় নির্ভরযোগ্য জাতীয় তথ্যের গুরুত্বও তুলে ধরেন তিতুমীর। তিনি বলেন, সহজলভ্য ও বিশ্বাসযোগ্য জাতীয় তথ্য না থাকলে দেশের উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক অগ্রগতি নিয়ে বিভ্রান্তিকর ব্যাখ্যা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
উপদেষ্টা বলেন, পরিসংখ্যান ব্যবস্থার এ সংস্কার সরকারি প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি বাড়ানো এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা উন্নয়নে সরকারের অঙ্গীকারের প্রতিফলন।
পরিসংখ্যান ব্যবস্থার রূপান্তরে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের কথা স্বীকার করে ড. তিতুমীর বিবিএস এবং পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিরলস প্রচেষ্টার প্রশংসা করেন। সংস্কার উদ্যোগ এগিয়ে নিতে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিমন্ত্রীর সহযোগিতার জন্যও তিনি ধন্যবাদ জানান।
চলমান উদ্যোগের মাধ্যমে বাংলাদেশে একটি নির্ভরযোগ্য, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ও সহজলভ্য পরিসংখ্যান ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিতুমীর।
আয়শা/০৮ নভেম্বর ২০২৬,/রাত ৮:৩০