স্পোর্টস ডেস্ক : সিলেটের শুক্রবারের সকালটা একটু বেশি নিরবতায় ঢাকা। আকাশজুড়ে ঝলমলে রোদ। মাঠে ক্যারিবীয় ব্যাটারদের দাপট, পুরনো বলে বাংলাদেশের বোলারদের নিষ্ফল চেষ্টা। সময় যত গড়াচ্ছিল, ততই যেন ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ হাতছাড়া হচ্ছিল স্বাগতিকদের।
হ্যাটট্রিক হয়ে গেলে একই সাথে ক্যারিয়ারের ষষ্টবারের মতো পাঁচ উইকেটও হয়ে যেত। ওই সময় না হলেও বেশি বেশি অপেক্ষা করতে হয়নি। জশুয়া বিশপকে ফিরিয়ে আরেকটি ফাইফার উত্তেজনায় মাতেন হাসান। এরপর মেহেদী হাসান মিরাজও তুলে নেন ১টি উইকেট। ৩২২ রানে ৮ উইকেট নিয়ে উইন্ডিজ গেছে লাঞ্চে, বাংলাদেশও প্যাভিলিয়নে গিয়েছে স্বস্তি নিয়ে।
দিনের শুরুটা অবশ্য বাংলাদেশের জন্য মোটেও স্বস্তির ছিল না। আগের দিনের দুই অপরাজিত ব্যাটার আমির জাঙ্গু ও জাস্টিন গ্রিভস পুরনো বলে সাবলীল ব্যাটিং করছিলেন। রান আসছিল অনায়াসে। বাংলাদেশের বোলারদের সামনে তখন উইকেটের দেখা পাওয়াই বড় চ্যালেঞ্জ। ক্যারিবীয়দের প্রতিরোধ ভাঙার অপেক্ষা দীর্ঘ হচ্ছিল। এর মধ্যেই মাঠে নেমে এল চোটের ছায়া। মেহেদী হাসান মিরাজের বলে জাঙ্গুর লেগ গ্লান্স করা শটের পেছনে ছুটেছিলেন সাদমান ইসলাম। ফাইন লেগের সীমানার কাছে বল আটকাতে গিয়ে ডাইভ দেন তিনি।
কিন্তু ঘাসে পিছলে গিয়ে আটকে যায় বাঁ পায়ের গোড়ালি। মুহূর্তেই মচকে যায় পা। যন্ত্রণায় কাতর সাদমানকে দেখে ছুটে আসেন ফিজিও বায়েজিদুল ইসলাম। মাঠেই চলে প্রাথমিক চিকিৎসা। কিন্তু তাতে স্বস্তি ফেরেনি। শেষ পর্যন্ত স্ট্রেচার আনা হয়। সতীর্থদের উৎকণ্ঠার মধ্যে সেটিতে করেই মাঠ ছাড়েন বাঁহাতি ওপেনার। তখন তার চোখেমুখে যন্ত্রণার ছাপ, আর বাংলাদেশের শিবিরে দুশ্চিন্তা। পরে হাসপাতালে গিয়ে তার এমআরআই করানো হয়।
সাদমান যখন মাঠ ছাড়ছেন, তখন ওয়েস্ট ইন্ডিজের সংগ্রহ ৭৮ ওভারে চার উইকেটে ২৫৯। আমির জাঙ্গু ১২৯, জাস্টিন গ্রিভস ৪১ রানে অপরাজিত। মনে হচ্ছিল, দিনের প্রথম ভাগটা নিজেদের করে নিয়েই এগোবে সফরকারীরা। কিন্তু ক্রিকেটের সৌন্দর্যই তো এখানে—একটি নতুন বল, একটি দুর্দান্ত ডেলিভারি, বদলে দিতে পারে গোটা দিনের গল্প। ৮০ ওভার শেষে দ্বিতীয় নতুন বল নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত। বল হাতে আক্রমণে আসেন তাসকিন আহমেদ। নতুন বলের আসল ঝলক দেখানোর অপেক্ষায় ছিলেন হাসান। দিনের নিজের প্রথম ওভারেই তিনি বুঝিয়ে দিলেন, কেন তাকে বাংলাদেশের আক্রমণের অন্যতম বড় অস্ত্র মনে করা হয়।
৮১তম ওভারের চতুর্থ বলে প্রথম শিকার আমির জাঙ্গু। অফ স্টাম্পের বেশ বাইরে ল্যান্ড করা বলটি মুহূর্তেই ভেতরে ঢুকে পড়ে। জাঙ্গু ভেবেছিলেন, ছেড়ে দিলেই বিপদ কাটবে। কিন্তু বলের গতিপথে ছিল অন্য পরিকল্পনা। সরাসরি আঘাত হানে অফ স্টাম্পে। উড়ে যায় বেল, থামে ক্যারিবীয় ব্যাটারের দুর্দান্ত ইনিংস। ২১২ বলে ১৩ চার ও দুই ছক্কায় ১৩৩ রান করে ফিরতে হয় তাকে। আগের দিন ৬৮ রানে হাসানের বলে ফিরতি ক্যাচ দিয়েও বেঁচে গিয়েছিলেন জাঙ্গু। এবার আর রক্ষা হয়নি।
যার বলে জীবন পেয়েছিলেন, তার বলেই শেষ হলো ইনিংস। জাঙ্গুর বিদায়ের রেশ কাটতে না কাটতেই পরের বলেই আরেকটি আঘাত। এবার শিকার ওয়েস্ট ইন্ডিজ অধিনায়ক রোস্টন চেজ। লেংথ থেকে বলটি ভেতরে ঢুকছিল। সোজা ব্যাটে রক্ষণাত্মক শট খেলতে গিয়ে ব্যাট ও প্যাডের মাঝে ফাঁক তৈরি করে ফেলেন চেজ। ব্যাটের ভেতরের কানায় লেগে বল চলে যায় উইকেটরক্ষক লিটন দাসের হাতে। দুর্দান্ত ক্যাচে দ্বিতীয় শিকার নিশ্চিত করেন লিটন। কোনো রান না করেই ফিরতে হয় চেইসকে। পরপর দুই বলে দুই উইকেট।
হাসানের সামনে তখন ইতিহাসের হাতছানি। হ্যাটট্রিকের বল মোকাবিলা করতে এলেন জশুয়া বিশপ। সিলেটের গ্যালারি থেকে প্রেসবক্স—সবখানেই উত্তেজনার পারদ চড়ছে। লেগ স্টাম্পের লাইনে করা হাসানের লেংথ বলটি ব্যাটে খেলতে চেয়েছিলেন বিশপ। কিন্তু বল গিয়ে আঘাত করে তার প্যাডে। জোরাল আবেদনে মুহূর্তেই আঙুল তুলে দেন আম্পায়ার। হাসানের সতীর্থরা ছুটে আসেন। আনন্দের বিস্ফোরণ ঘটে বাংলাদেশের ড্রেসিংরুমে।
মনে হচ্ছিল, সিলেটের আকাশে আরেকটি স্মরণীয় হ্যাটট্রিকের গল্প লেখা হতে যাচ্ছে। সেই গল্পের শেষ বাক্যটি লিখতে দিল না রিভিউ। বিশপ দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে আম্পায়ারের রায়ের বিরুদ্ধে আবেদন করেন। রিপ্লেতে আলট্রাএজে ধরা পড়ে, বলটি ব্যাটের ভেতরের কানায় লেগে প্যাডে আঘাত করেছে। মুহূর্তেই বদলে যায় সিদ্ধান্ত। হ্যাটট্রিকের উচ্ছ্বাস থেমে যায়, বিশপ ফিরে পান জীবন। হাসানের হাত থেকে ফসকে যায় ব্যক্তিগত ইতিহাসের সুযোগ। তবে তার বোলিংয়ের ঝলক তাতে একটুও ম্লান হয়নি। সিলেটের সকালের গল্পে শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে উজ্জ্বল নাম হাসান মাহমুদ।
আয়শা/০৬ নভেম্বর ২০২৬,/দুপুর ১২:০৮