স্পোর্টস ডেস্ক : হোটেলের একটা সাধারণ বিছানার চাদর। পকেট থেকে খরচ করা মাত্র ১০ ডলারের রং আর তুলি। তাতেই মনের মাধুরী মিশিয়ে লেখা—‘লাস মালভিনাস সন আর্জেন্টিনাস’ (মালভিনাস আর্জেন্টিনার)। আটলান্টার সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডকে হারানোর পর ওতামেন্দি-লো সেলসোদের হাতে দেখা সেই চাদরটাই এখন আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম আবেগের এক দলিল। কিন্তু নেপথ্যের কারিগর কে? কীভাবে জন্ম নিল বিশ্ব কাঁপানো সেই ব্যানার?
বিশ্বের বড় বড় সংবাদমাধ্যমের পাতায় ঝড় তোলা সেই ছবির নেপথ্যের গল্পটা কোনো রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা নয়, বরং এক সাধারণ ভক্তের তাৎক্ষণিক আবেগ আর দুঃসাহসের গল্প। সেই ব্যানারের নেপথ্য কারিগরের নাম সান্তিয়াগো। ‘পারফিল’ পত্রিকার সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি নিজের পুরো নাম বা পরিচয় গোপন রাখার অনুরোধ করেছেন। তবে বুক ভরা গর্ব নিয়ে শুনিয়েছেন সেই রোমাঞ্চকর গল্প।
বিশ্বকাপের উন্মাদনায় শামিল হতে আর সবার মতোই যুক্তরাষ্ট্রে এসেছিলেন সান্তিয়াগো। কিন্তু সেমিফাইনালে প্রতিপক্ষ যখন ইংল্যান্ড, তখন ম্যাচটা আর কেবল ফুটবলে সীমাবদ্ধ ছিল না। ম্যাচের দিন সকালে আটলান্টার রাস্তায় হাজারো আর্জেন্টাইন সমর্থকের র্যালির উন্মাদনা ছুঁয়ে যায় তাকে। সান্তিয়াগো বলেন, ‘ম্যাচের দিন সকালেই আইডিয়াটা মাথায় আসে। আমরা হোটেলের কাছের একটা দোকান থেকে ১০ ডলারেরও কম দামে সস্তা রং আর একটা তুলি কিনি।’
কিন্তু কাপড় পাবেন কোথায়? সান্তিয়াগো ও তার বন্ধুরা মিলে হোটেলের রুমে ফিরে বিছানার চাদরটাকেই টেনে নেন, ‘আমরা বিছানার চাদরটা মাঝখান থেকে দুই ভাগ করলাম। মেঝেতে বিছিয়ে মনের ক্ষোভ আর ভালোবাসা ঢেলে দিলাম সেই চাদরে।’ কিন্তু কেন এই ব্যানার? সান্তিয়াগোর সোজা সাপটা উত্তর, ‘বিশ্বকাপ চলাকালীন বিদেশিদের কিছু মন্তব্য আমাদের খুব আঘাত করেছিল। অনেকে বলছিল, দ্বীপগুলো আমরা যেভাবে হারিয়েছি, সেভাবেই নাকি আমাদের ওটা হারানো উচিত ছিল। এটা মেনে নেওয়া যায় না।’
প্যান্টের ভেতর লুকিয়ে স্টেডিয়ামে প্রবেশ
আসল চ্যালেঞ্জটা ছিল স্টেডিয়ামের গেটে। এফবিআই, ডিইএসহ মার্কিন কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলোর নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার চাদরে ঢাকা ছিল মারাকানা-সদৃশ সেই স্টেডিয়াম। বিশেষ করে ১৯৮২ সালের ফকল্যান্ড (মালভিনাস) যুদ্ধ সংক্রান্ত যে কোনো ব্যানার বা রাজনৈতিক বার্তা ঠেকাতে কঠোর নির্দেশনা ছিল নিরাপত্তারক্ষীদের প্রতি।
এমন পরিস্থিতিতে সান্তিয়াগো এক চরম ঝুঁকিপূর্ণ অথচ কার্যকর পথ বেছে নেন। ব্যানারটিকে যত ছোট করা সম্ভব ভাঁজ করে তিনি নিজের প্যান্টের ভেতরে লুকিয়ে ফেলেন। নিপুণ সেই চাতুরীতে বোকা বনে যায় মেটলাইফের মেটাল ডিটেক্টর আর নিরাপত্তারক্ষীরা। ভেতরে ঢুকে পুরো ৯০ মিনিট ব্যানারটি আড়ালেই রেখেছিলেন তিনি। রেফারির শেষ বাঁশি বাজার সাথে সাথে, যখন ইংল্যান্ডের ওপর জয় নিশ্চিত হলো, মাঠের একদম ধার ঘেঁষে গ্যালারিতে দাঁড়িয়ে চাদরটি মেলে ধরেন তিনি।
বাকি ইতিহাসটা রূপকথার মতো। সান্তিয়াগো স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘আমি যখন ফুল-ব্যাক গনজালো মন্তিয়েলকে সামনে দেখলাম, ওটার দিকে ছুঁড়ে দিলাম। ও লুফে নিয়ে পাস দিল জিওভানি লো সেলসোকে। লো সেলসোই প্রথম ওটা মেলে ধরে।’ মুহূর্তের মধ্যে ওতামেন্দিসহ বাকি ফুটবলাররা এসে চাদরটি উঁচিয়ে ধরেন ক্যামেরার সামনে।
হোটেল রুমের এক পাগলামি যে বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তৈরি করবে, তা ভাবেননি সান্তিয়াগোও। স্বপ্ন সত্যি হয়েছে, কিন্তু গল্প এখানেই শেষ নয়। সান্তিয়াগো এখন তার সঙ্গী তামারাকে নিয়ে সেই ঐতিহাসিক বিছানার চাদরটি ফেরত পাওয়ার মিশনে নেমেছেন। আর্জেন্টিনার ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের (এএফএ) প্রেসিডেন্ট ক্লাউদিও ‘চিকি’ তাপিয়ার মাধ্যমে খেলোয়াড়দের কাছে বার্তা পাঠিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু ওখান থেকে যে ফিরতি বার্তা এসেছে, তা শুনে সান্তিয়াগোর চোখ ছানাবড়া!
তাপিয়া জানিয়েছেন, ‘ছেলেরা (খেলোয়াড়রা) ওটা আর ফেরত দিতে চাইছে না।’ বিশ্বজয়ের সারথিরা সেই আবেগের চাদর নিজেদের ড্রেসিংরুমের স্মারক বানিয়ে নিয়েছেন। আজকের ফাইনালের টিকিটও পকেটে আছে সান্তিয়াগোর। তবে আজ স্পেনের বিপক্ষে ফাইনালে নতুন কোনো ব্যানার বানানোর পরিকল্পনা নেই তার। প্যান্টে লুকিয়ে কোনো চাদরও নিতে হবে না। তবে সাথে থাকছে অন্য এক বিশ্বাস—আর্জেন্টাইন লোক সংস্কৃতির প্রতীক ‘গাউচিতো জিলের’ ছবি।
সান্তিয়াগোর আশা, ‘আমি সব ম্যাচেই মাঠে ছিলাম, আজও থাকব। নতুন কোনো পতাকা নয়, এবার গাউচিতো জিলের আশীর্বাদে আমাদের জার্সিতে চতুর্থ তারকা (চতুর্থ বিশ্বকাপ) যুক্ত হবে।’বৃষ্টির মধ্যে আবেগের গান, প্রতিপক্ষের জাতীয় সঙ্গীতে গ্যালারির গর্জন, আর হোটেলের বিছানার চাদরে সার্বভৌমত্বের দাবি—আর্জেন্টাইনরা এভাবেই বিশ্বকাপকে যাপন করে। যেখানে চরম অপেশাদারি এক টুকরো চাদরও চোখের পলকে হয়ে ওঠে এক অমর জাতীয় প্রতীক।
আয়শা/১৯ জুলাই ২০২৬,/রাত ৯:২২