আন্তর্জাতিক ডেস্ক : হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে তেল রপ্তানির বিকল্প পথ তৈরি করতে সিরিয়া, ইরাক ও যুক্তরাষ্ট্র ৫০০ মাইল দীর্ঘ একটি পুরোনো তেল পাইপলাইন পুনরায় চালুর পরিকল্পনা করছে। ইরাকের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ও আঞ্চলিক নেতাদের বরাতে এমন তথ্য প্রকাশ করেছে মিডল ইস্ট আই।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাইপলাইনটি ইরাকের উত্তরাঞ্চলের কিরকুক থেকে সিরিয়ার ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলীয় শহর বানিয়াস পর্যন্ত বিস্তৃত। ১৯৮০-এর দশক থেকে বন্ধ হয়ে থাকা এই পাইপলাইন পুনরায় চালু হলে হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে ইরাকের তেল সরাসরি ভূমধ্যসাগরে পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হবে। এতে ইরানের নিয়ন্ত্রিত হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে পারে।
মিডল ইস্ট আই জানিয়েছে, আগামী সপ্তাহে ওয়াশিংটনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জাইদির বৈঠকে এ প্রকল্প নিয়ে একটি চুক্তি ঘোষণা করা হতে পারে। বৈঠকের আগে প্রকল্পের বিভিন্ন দিক নিয়ে কাজ করছেন তুরস্কে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত এবং সিরিয়া ও ইরাকবিষয়ক বিশেষ দূত টম বারাক।
ইরাকের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, টম বারাক এই পাইপলাইনকে শুধু একটি জ্বালানি প্রকল্প হিসেবে দেখছেন না। বরং তিনি এটিকে লেভান্ট অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র ও স্থানীয় সরকারগুলোর জন্য লাভজনক আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সহযোগিতার একটি মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চান।
পাইপলাইনটি ১৯৫২ সালে ইরাক পেট্রোলিয়াম কোম্পানি নির্মাণ করে। প্রতিদিন প্রায় তিন লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল পরিবহনের সক্ষমতা ছিল এতে। তবে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় সিরিয়া ইরানের পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় ১৯৮০-এর দশকে বাগদাদ পাইপলাইনটি বন্ধ করে দেয়। ২০০৩ সালে ইরাকে মার্কিন আগ্রাসনের পর এটি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং বর্তমানে সম্পূর্ণ অকেজো অবস্থায় রয়েছে।
সূত্রগুলোর ভাষ্য, পাইপলাইনটি পুনরায় চালু করতে শুধু সংস্কার নয়, অনেক অংশ নতুন করে নির্মাণ করতে হতে পারে। নতুন স্টোরেজ ট্যাংক, পাম্পিং স্টেশন এবং বিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনের পাশাপাশি পুরো প্রকল্প শেষ করতে দুই থেকে তিন বছর সময় লাগতে পারে। এ কাজের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি কোম্পানিকে নিয়ে একটি কনসোর্টিয়ামও গঠনের প্রস্তুতি চলছে।
২০২৪ সালের শেষ দিকে সিরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর সিরিয়া ও ইরাক প্রথমবারের মতো পাইপলাইনটি পুনরুজ্জীবিত করার বিষয়ে আলোচনা শুরু করেছিল। তবে তখন তা খুব বেশি অগ্রসর হয়নি। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানকে ঘিরে উত্তেজনা এবং হরমুজ প্রণালিতে নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ার পর বিষয়টি নতুন গুরুত্ব পেয়েছে।
যুদ্ধ চলাকালে ইরাক সীমিত পরিসরে সিরিয়ার মধ্য দিয়ে ট্যাংকার ট্রাকে অপরিশোধিত তেল পরিবহন করলেও সেটি বাণিজ্যিক চাহিদা পূরণের জন্য যথেষ্ট ছিল না। ফলে স্থায়ী বিকল্প রুট তৈরির প্রয়োজনীয়তা আরও বেড়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশ্লেষক সারহাং হামাসাইদ বলেন, যুদ্ধ পরিস্থিতি ইরাককে বুঝিয়ে দিয়েছে যে আঞ্চলিক জ্বালানি ও বাণিজ্য ব্যবস্থায় সিরিয়াকে এড়িয়ে চলা সম্ভব নয়। ফলে দুই দেশের সম্পর্ক নতুন বাস্তবতায় প্রবেশ করেছে।
মিডল ইস্ট আই আরও জানিয়েছে, সম্ভাব্য চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে অংশ নিতে সিরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদ আল-শাইবানির যুক্তরাষ্ট্র সফরেরও সম্ভাবনা রয়েছে।
যদিও ইরাক সরকারের ওপর ইরানপন্থী শিয়া রাজনৈতিক দল ও মিলিশিয়াদের যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে, তারপরও বর্তমান সিরীয় প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারে বাগদাদ আগ্রহী হয়ে উঠছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসন সিরিয়ার ওপর থেকে একাধিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করেছে এবং দেশটিকে সন্ত্রাসবাদের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষক দেশের তালিকা থেকেও বাদ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। এর ফলে মার্কিন কোম্পানিগুলোর জন্য সিরিয়ায় বড় অবকাঠামো প্রকল্পে কাজ করার পথ সহজ হতে পারে।
এরই মধ্যে ইরাক সরকার হাদিসা ও কিরকুক থেকে বানিয়াস পর্যন্ত পাইপলাইন প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ক্যাপিটাল টিআই, শেভরন এবং কাতারের একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রাথমিক চুক্তি অনুমোদন করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে শুধু ইরাক নয়, পুরো অঞ্চলের জ্বালানি রপ্তানির ভূরাজনৈতিক সমীকরণ বদলে যেতে পারে। বর্তমানে ইরাক তার প্রায় ৯৫ শতাংশ তেল রপ্তানির জন্য হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরশীল। দেশটির বাজেটের প্রায় ৯০ শতাংশই আসে তেল বিক্রির আয় থেকে। জ্বালানিবিষয়ক বিশ্লেষণা প্রতিষ্ঠান ভোরটেক্সার তথ্য অনুযায়ী, গত মে মাসে সমুদ্রপথে ইরাকের তেল রপ্তানি আগের বছরের গড়ের মাত্র ৮ শতাংশে নেমে এসেছিল। এমন পরিস্থিতিতে বিকল্প রপ্তানি পথ তৈরি করা বাগদাদের জন্য অর্থনৈতিক ও কৌশলগত। দুই দিক থেকেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সূত্র : মিডল ইস্ট আই
অনিমা/১৩ জুলাই ২০২৬,/সকাল ১০:৪১