স্পোর্টস ডেস্ক : গোলদাতারাই নায়ক হন। তাদের গোলে গ্যালারি গর্জে ওঠে। কিছু নীরব যোদ্ধা করতালি চান না। তারা বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন দলের স্বপ্নকে রক্ষা করার জন্য। ক্রিস্তিয়ান রোমেরো সেই নীরব যোদ্ধাদেরই একজন। বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার আক্রমণে লিওনেল মেসি যেমন শিল্পী, তেমনি রক্ষণভাগে রোমেরো একজন সৈনিক। প্রতিপক্ষের স্ট্রাইকারদের জন্য তিনি আতঙ্ক, সতীর্থদের কাছে অবিচল আস্থার প্রতীক। বল দখলের লড়াইয়ে নির্ভীক।
১৯৯৮ সালের ২৭ এপ্রিল আর্জেন্টিনার কর্দোবা প্রদেশে জন্ম রোমেরোর। তার বেড়ে ওঠা ছিল সাধারণ একটি মধ্যবিত্ত পরিবারে। পরিবারে অর্থের প্রাচুর্য ছিল না, ছিল সততা, পরিশ্রম আর স্বপ্ন দেখার সাহস। ছোটবেলায় নতুন বুট কেনার সামর্থ্যও অনেক সময় ছিল না। বাবা-মা কখনও ছেলের স্বপ্নকে থামিয়ে দেননি। পরিবারের ত্যাগ, মায়ের ভালোবাসা আর বাবার কঠোর পরিশ্রমই ছিল তার সবচেয়ে বড় পুঁজি। সেই সংগ্রামের পথ পেরিয়েই আজ তিনি বিশ্বের অন্যতম সেরা ডিফেন্ডার খেলোয়াড়।
ফুটবলের হাতেখড়ি স্থানীয় ক্লাবে। বেলগ্রানো একাডেমিতে নিজের প্রতিভার পরিচয় দেন। সেখান থেকেই ইউরোপের দরজা খুলে যায়। ইতালির জেনোয়া, ইউভেন্টাস এবং আতালান্তা—ধাপে ধাপে নিজেকে গড়ে তোলেন। আতালান্তায় খেলেই তিনি ইতালিয়ান লিগের অন্যতম সেরা ডিফেন্ডারের প্রতিষ্ঠা পান। ২০২০-২১ মৌসুমে জিতে নেন লিগের সেরা ডিফেন্ডারের পুরস্কার।
ইংল্যান্ডের টটেনহ্যাম হটস্পারে যোগ দিয়ে আরও পরিণত হন। আর্জেন্টিনা জাতীয় দলে তার অভিষেক ২০২১ সালে। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই কোচ লিওনেল স্কালোনির আস্থাভাজন হয়ে ওঠেন। একই বছর কোপা আমেরিকা, ২০২২ সালের ফিফা বিশ্বকাপ এবং আর্জেন্টিনার ধারাবাহিক সাফল্যে তার অবদান ছিল অসাধারণ।
চলতি বিশ্বকাপে আবারও প্রমাণ দিলেন তিনি। শেষ ষোলোর ম্যাচে মিশরের বিপক্ষে ৬৭ মিনিট পর্যন্ত আর্জেন্টিনা ২-০ গোলে পিছিয়ে। লিওনেল মেসি একটি পেনাল্টিও মিস করেছেন। গ্যালারিতে তখন নেমে এসেছে নীরবতা। কোটি কোটি আর্জেন্টাইন সমর্থকের চোখে হতাশা। মনে হচ্ছিল, বিশ্বচ্যাম্পিয়নের যাত্রা বুঝি এখানেই শেষ। ঠিক তখনই সামনে এলেন রোমেরো।
৭৯ মিনিটে কর্নার থেকে উড়ে আসা বলে অসাধারণ এক হেড। বল জড়িয়ে গেল জালে। স্কোরলাইন হলো ২-১। গোলটি শুধু ব্যবধান কমায়নি, আর্জেন্টিনার হারিয়ে যাওয়া বিশ্বাসও ফিরিয়ে এনেছিল। সেই এক মুহূর্তেই বদলে যায় ম্যাচের আবহ। কয়েক মিনিট পর মেসির সমতাসূচক গোল, এরপর যোগ করা সময়ে এনজো ফার্নান্দেজের জয়সূচক গোলে ৩-২ ব্যবধানে অবিশ্বাস্য জয় তুলে নেয় আর্জেন্টিনা। ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তনের আগুন প্রথম জ্বালিয়েছিলেন রোমেরোই।
রোমেরোকে নিয়ে কোচ লিওনেল স্কালোনির কথা, ‘ক্রিস্তিয়ান প্রতিটি মুহূর্তে দলের জন্য নিজের সর্বস্ব উজাড় করে দেয়। সে লড়াই ছেড়ে দেয় না,তার মধ্যে একজন নেতার সব গুণ রয়েছে।’রোমেরো নিজের কথা, আমি কখনও ব্যক্তিগত অর্জনের জন্য খেলি না। দেশের জার্সি পরার অনুভূতি পৃথিবীর সবকিছুর চেয়ে বড়। প্রয়োজন হলে নিজের শরীর দিয়েও বল আটকাব, আর্জেন্টিনার জন্য সবকিছু উজাড় করে দেওয়াই আমার দায়িত্ব।
পরিবারের প্রতিও রোমেরো সমান নিবেদিত। স্ত্রী কারেন কাভায়ের এবং সন্তানদের তিনি নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি বলে মনে করেন। মাঠের বাইরে তিনি শান্ত, বিনয়ী ও পরিবারপ্রেমী একজন মানুষ। মাঠে নামলেই তিনি হয়ে ওঠেন এক নির্ভীক যোদ্ধা। ফুটবলে সব নায়কের হাতে গোলের গল্প লেখা থাকে না। কারও কারও গল্প লেখা হয় ট্যাকল, বল রক্ষায়।
আয়শা/০৮ জুলাই ২০২৬,/দুপুর ১:২২