আন্তর্জাতিক ডেস্ক : ইরানের সঙ্গে সমঝোতা স্মারককে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মধ্যে বড় ধরনের মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক হার্লান উলম্যান। তার দাবি, এই সমঝোতা নিয়ে নেতানিয়াহু অসন্তুষ্ট এবং তিনি চুক্তিটি ভেস্তে দিতে আগ্রহী।
কৌশলগত পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘দ্য কিলওয়েন গ্রুপ’-এর চেয়ারম্যান উলম্যান আল-জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, নেতানিয়াহু চুক্তি নিয়ে ক্ষুব্ধ। তার ভাষায়, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী এই সমঝোতা ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করতে পারেন।
ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতের অবসান ঘটাতে ট্রাম্প সম্প্রতি একটি সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেছেন। যদিও নেতানিয়াহু প্রকাশ্যে এ চুক্তির সমালোচনা করেননি, বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদন ও পর্যবেক্ষকদের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে যে তিনি এ উদ্যোগে সন্তুষ্ট নন। তাদের মতে, এই সমঝোতা আগামী অক্টোবরে অনুষ্ঠেয় নির্বাচনে তার পুনর্নির্বাচনের সম্ভাবনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
উলম্যান আরও বলেন, ট্রাম্প সরাসরি নেতানিয়াহুকে আক্রমণ করে এমন ইঙ্গিত দিয়েছেন যে সবকিছু তার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এর ফলে আসন্ন নির্বাচনে নেতানিয়াহুর প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের প্রতি পরোক্ষ সমর্থনের পরিবেশ তৈরি হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতার পর নেতানিয়াহু রাজনৈতিকভাবে কঠিন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন। মধ্যপ্রাচ্যকে নতুনভাবে রূপ দেওয়ার যে প্রতিশ্রুতি তিনি দীর্ঘদিন ধরে দিয়ে আসছিলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে তা বাস্তবায়নের সম্ভাবনা প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
একদিকে গাজা ও লেবাননে স্থায়ী সাফল্য অর্জনে ব্যর্থতার অভিযোগ, অন্যদিকে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক চাপ—সব মিলিয়ে চ্যালেঞ্জের মধ্যে রয়েছেন তিনি। একই সময়ে ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও তার রাজনৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করেছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
নির্বাচনের ঘোষণা দেওয়া হলেও বিভিন্ন জনমত জরিপে নেতানিয়াহুর ডানপন্থি জোটের জন্য অনুকূল চিত্র দেখা যাচ্ছে না। দুর্নীতির অভিযোগ এবং ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের নিরাপত্তা ব্যর্থতার প্রশ্নও তাকে দীর্ঘদিন ধরে চাপে রেখেছে।
বিশ্লেষকদের ভাষ্য, ব্যাপক সামরিক অভিযান পরিচালনার পরও হামাস, হিজবুল্লাহ এবং ইরান সক্রিয় রয়েছে। বিভিন্ন ফ্রন্টে দীর্ঘ সংঘাত সত্ত্বেও স্থায়ী বিজয় না আসা এবং সেনা হতাহতের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় ভোটারদের কঠিন প্রশ্নের মুখে পড়তে হচ্ছে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীকে।
বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার লাপিদও নেতানিয়াহুর যুদ্ধকৌশলের সমালোচনা করেছেন। তার অভিযোগ, প্রধানমন্ত্রী চূড়ান্ত পরীক্ষায় ব্যর্থ হয়েছেন এবং যুদ্ধে কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জন করতে পারেননি।
এদিকে গাজায় সামরিক অভিযানের কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও চাপ বেড়েছে। যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির পর পশ্চিমা বিশ্বে নেতানিয়াহুর গ্রহণযোগ্যতা কমেছে বলে বিশ্লেষকদের অভিমত।
পর্যবেক্ষকদের মতে, সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতির ওপর তার অতিনির্ভরশীল অবস্থান থেকে। তাদের দাবি, একপেশে নীতির কারণে ওয়াশিংটনে দ্বিদলীয় সমর্থন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একই সঙ্গে বহুদিনের ঘনিষ্ঠ মিত্র ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি তার রাজনৈতিক সংকটকে আরও গভীর করেছে। ফলে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক—উভয় ক্ষেত্রেই ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে রয়েছেন ইসরায়েলের এই নেতা।
সূত্র : আল-জাজিরা।
অনিমা/১৯ জুন ২০২৬,/সন্ধ্যা ৬:৩১