ডেস্কনিউজঃ ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধের পটভূমিতে জারি করা প্রায় তিন মাসব্যাপী অচলাবস্থার পর, ইরানি কর্তৃপক্ষ আজ মঙ্গলবার (২৬ মে) আংশিকভাবে ইন্টারনেট সংযোগ পুনর্বহাল করেছে। একটি ইন্টারনেট পর্যবেক্ষণ সংস্থা, একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং ইরানের অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো এই তথ্য জানিয়েছে। খবর এএফপির।
ইন্টারনেট বন্ধ থাকার কারণে ইরানিরা আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক থেকে বহুলাংশে বিচ্ছিন্ন ছিল; সে সময় কেনাকাটা, রাইড-শেয়ারিং এবং শিক্ষার মতো দৈনন্দিন কাজের জন্য কেবল মাত্র একটি অভ্যন্তরীণ ইন্ট্রানেট সচল ছিল।
ইন্টারনেট পর্যবেক্ষণ সংস্থা নেটব্লকস সামাজিক মাধ্যম এক্সে জানিয়েছে, বন্ধের ৮৮তম দিনে ইরানের ইন্টারনেট সংযোগ আংশিক পুনর্বহালের ‘লাইভ পরিমাপ’ দেখা যাচ্ছে। সংস্থাটি আরও বলেছে, এটি আধুনিক ইতিহাসের দীর্ঘতম দেশব্যাপী ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের অবসান কি না তা অবশ্য অস্পষ্ট।
ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ রেজা আরেফ এক্সে এক পোস্টে লিখেছেন, সাইবার স্পেসে অবাধ ও নিয়ন্ত্রিত প্রবেশাধিকারের দিকে যাত্রার প্রথম পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তিনি আরও যোগ করেন, ইরানিদের দাবি পূরণ করা হবে।
রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ইরনা এবং ফার্স নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, ফিক্সড ব্রডব্যান্ড সেবা ব্যবহারকারীদের জন্য সম্পূর্ণ আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট সংযোগ পুনর্বহাল করা হয়েছে। তবে ইন্টারনেট মনিটর নেটব্লকস এখনো এই বিষয়টি নিশ্চিত করেনি।
ইরানের ভেতরের লোকজনও জানিয়েছেন যে, মোবাইল ইন্টারনেট এখনো বন্ধ রয়েছে তবে ওয়াই-ফাইসহ বাসার ইন্টারনেট চালু হয়েছে; যদিও কিছু সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের জন্য এখনো ভিপিএন-এর প্রয়োজন হচ্ছে।
পশ্চিমের শহর কেরমানশাহর নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ২২ বছর বয়সী এক নারী বলেন, ‘কয়েক মিনিট আগে আমি আমার বাসার ইন্টারনেট ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক ওয়েবসাইটগুলো খুলতে পেরেছি।’
তেহরানের এক ব্যবহারকারী জানান, তেহরানে তাঁর কোম্পানির ইন্টারনেট সেবা চালু হয়েছে কিন্তু মোবাইল সংযোগ আগের মতোই রয়ে গেছে। অন্যরা জানিয়েছেন, সামগ্রিক ইন্টারনেট সংযোগ এখনো অত্যন্ত ত্রুটিপূর্ণ বা জোড়াতালিসর্বস্ব অবস্থায় রয়েছে।
‘এখনো দীর্ঘ পথ বাকি’
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এই ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট জারি করা হয়েছিল। এর আগে, গত ৮ জানুয়ারি দেশজুড়ে ব্যাপক সরকারবিরোধী বিক্ষোভের কারণেও একইভাবে ইন্টারনেট বন্ধ করা হয়েছিল।
অধিকারকর্মীরা বলছেন, জানুয়ারির ইন্টারনেট বন্ধের উদ্দেশ্য ছিল বিক্ষোভের ওপর চালানো দমনপীড়নের মাত্রা গোপন করা (মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলোর মতে ওই দমন অভিযানে কয়েক হাজার মানুষ নিহত হয়েছিল) এবং নতুন কোনো বিক্ষোভের আয়োজন ঠেকানো।
মার্কিন নেটওয়ার্ক পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান কেন্টিক-এর ইন্টারনেট বিশ্লেষণ বিভাগের প্রধান ডগ ম্যাডোরি বলেন, ‘এই আংশিক পুনর্বহালকে সঠিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা দরকার।’ তিনি এক্স-এ লিখেছেন, ‘৮ জানুয়ারির আগের ট্রাফিক ভলিউম বা ইন্টারনেট ব্যবহারের স্তরে ফিরে যেতে ইরানকে এখনো দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে।’
ইন্টারনেট বন্ধের এই বিষয়টি ইরানের ভেতরেও বেশ বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল। অপেক্ষাকৃত নরমপন্থী বা উদারপন্থী হিসেবে পরিচিত প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের প্রশাসন এমন একটি ব্যবস্থার অবসান ঘটাতে উদগ্রীব ছিল, যা দেশের অর্থনীতিরও ব্যাপক ক্ষতি করছিল। তবে এই ধরনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার চূড়ান্ত ক্ষমতা প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানের হাতে নেই।
ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিশনের সদস্য ইয়াঘুব রেজাজাদেহ গতকাল সোমবার হামশাহরি দৈনিককে বলেছেন, এই ধরনের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কট্টরপন্থী মোহাম্মদ বাঘের জোলঘাদ্রের নেতৃত্বাধীন ‘সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের’ ওপর ন্যস্ত থাকে।
আজ মঙ্গলবার ইরানের বিচার বিভাগ রাষ্ট্রপতির একটি নবগঠিত সংস্থাকে স্থগিত রাখার আদেশ দেয়, যেটি ইন্টারনেট পুনর্বহালের নির্দেশ দিয়েছিল। এর আগে গত ১২ মে পেজেশকিয়ান কর্তৃক দেশের সাইবার স্পেস পরিচালনা ও সংগঠিতকরণের বিশেষ সদর দপ্তর গঠিত হয়েছিল।
সরকারের মুখপাত্র ফাতেমা মোহাজেরানির মতে, স্থানীয় গণমাধ্যমে পেজেশকিয়ান এই ডিক্রি বা আদেশ জারি করেছেন বলে প্রতিবেদন প্রকাশের পর, ওই সংস্থাটি সোমবার ইরানে ইন্টারনেট পুনর্বহালের সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিল।
ইন্টারনেট সংযোগ কিছুটা ফিরে আসায় কিছু ইরানি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আনন্দ প্রকাশ করেছেন। একজন এক্স-এ লিখেছেন, ‘ভিপিএন ছাড়াই ইউটিউব!!! ওহ খোদা, আমি কি স্বপ্ন দেখছি?’ অন্য একজন এক্স-এর আগের নাম ব্যবহার করে লিখেছেন, ‘হ্যালো আমার প্রিয় টুইটার।’
বিপুল/২৬.০৫.২০২৬/রাত ১০.৪৫