ডেস্কনিউজঃ কথায় বলে, শাসকের কোনো ঘর থাকে না, রাজমুকুটের নিচে লুকিয়ে রাখতে হয় সব ব্যক্তিগত কান্না। কিন্তু বুধবার গাজীপুরের সাতাশ মৌজার এক চিলতে বিকেলে, সমস্ত রাজকীয় প্রটোকল, ক্যামেরার ফ্ল্যাশ আর হাজারো মানুষের স্লোগানকে এক নিমেষে ম্লান করে দিল একজন পুত্রের অবাধ্য চোখের জল।
আয়োজনটি ছিল দেশের প্রথম ‘জাতীয় দুর্যোগ প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট’-এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের। রাষ্ট্রীয় গাম্ভীর্যে মোড়া এক নিখুঁত অনুষ্ঠান। কিন্তু সেই মঞ্চেই যখন গাজীপুরের জেলা প্রশাসক মো. নূরুল করিম ভূঁইয়া প্রধানমন্ত্রীর হাতে তুলে দিলেন একটি বিশেষ স্মারক, তখন চারপাশের দেয়ালগুলো যেন মুহূর্তের জন্য অদৃশ্য হয়ে গেল।
উপহারের মোড়কটি খোলার পর জানা গেল, এটি কোনো আধুনিক স্মারক নয়; এটি ১৯৭৮ সালের ১৮ ডিসেম্বরের এক খণ্ড জীবন্ত ইতিহাস।
তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমান যখন গাজীপুরকে মহকুমা ঘোষণা করেছিলেন, এটি ছিল সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তের এক অম্লান স্মারক চিহ্ন। যেখানে একাকার অতীত আর বর্তমান
স্মারকটি হাতে নিতেই বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাত দুটি যেন সামান্য কেঁপে উঠল। ৪৮ বছর! কম সময় তো নয়। এই দীর্ঘ চার দশকে পদ্মা-মেঘনা দিয়ে কত জল গড়িয়ে গেছে, তার নিজের জীবনে এসেছে কত ঝড়-ঝাপটা, একাকিত্বের দীর্ঘ প্রবাস জীবন আর রাজনীতির নির্মম কণ্টকপথ।
কিন্তু বাবার এই স্মৃতিচিহ্নটি হাতে নেওয়া মাত্রই তিনি যেন এক পলকে ফিরে গেলেন তার সেই চেনা শৈশবে।
তিনি দেশের প্রধানমন্ত্রী, কিন্তু ওই মুহূর্তে তিনি আর রাষ্ট্রপ্রধান ছিলেন না; তিনি ছিলেন এক নিঃসঙ্গ পুত্র, যে বহুকাল পর বাবার কোনো একটা প্রিয় জিনিস খুঁজে পেয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রী স্মারকটির গায়ে আলতো করে হাত বোলালেন। তার চোখ দুটি বন্ধ হয়ে এলো। উপস্থিত সবাই এক পরম বিস্ময়ে দেখল, এক জননেতার কঠোর অবয়ব গলে কিভাবে এক ব্যাকুল সন্তানের আকুলতা প্রকাশ পাচ্ছে।
স্মারকটির প্রতিটি কোণ ছুঁয়ে তিনি যেন অনুভব করতে চাইলেন বাবার সেই চওড়া হাত, তার গায়ের চেনা সুবাস, আর তার সেই চিরন্তন কর্মের ‘ফিল’। কিছুক্ষণের জন্য সাতাশের সেই মঞ্চে এক মহিমান্বিত নীরবতা নেমে এলো—যেন চার দশক পর পিতা আর পুত্র কোনো এক অদৃশ্য কোলাকুলিতে মেতে উঠেছেন।
আজকের দিনে যখন রাষ্ট্রীয় উপহার মানেই কেবলই কিছু আনুষ্ঠানিকতা, সেখানে জেলা প্রশাসকের এই দূরদর্শী ও স্পর্শকাতর উদ্যোগটি ছিল এককথায় অনন্য। উপহার যে শুধু চোখকে নয়, সরাসরি আত্মাকে ছুঁয়ে যেতে পারে—এই ঘটনা তারই এক চিরকালীন উদাহরণ হয়ে রইল। বাবার এমন এক জাদুকরী স্মৃতি ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মঞ্চেই জেলা প্রশাসকের প্রতি তাঁর গভীর, আন্তরিক ও ব্যতিক্রমী কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত সুধীজন ও সাধারণ মানুষের চোখও তখন ভিজে উঠেছিল। প্রত্যেকেই জেলা প্রশাসকের এই গভীর ভাবনার ভূয়সী প্রশংসা করে বলছিলেন, ‘দামি জিনিস অনেকেই দিতে পারে, কিন্তু এভাবে কারো বুক চিরে স্মৃতি এনে উপহার দেওয়ার ক্ষমতা সবার থাকে না। রাজনীতির মঞ্চে কত ইতিহাসই তো লেখা হয়, কিন্তু সাতাশের গোধূলি সাক্ষী রইল এক অলিখিত কাব্যের। যেখানে সময়ের সীমানা পেরিয়ে, এক টুকরো স্মারকের হাত ধরে, এক পুত্রের একলা হৃদয়ে পিতা ফিরে এলেন তার সমস্ত গৌরব আর ভালোবাসা নিয়ে।’
বিকেলের সোনাঝরা আলো যখন ম্লান হয়ে আসছিল, প্রধানমন্ত্রীর গাড়িবহর যখন ঢাকার উদ্দেশে রওনা দিল, তখনও সাতাশের বাতাসে যেন এক পরম সত্য প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল—মানুষ চলে যায়, কিন্তু পিতার রেখে যাওয়া আদর্শ আর সন্তানের হৃদয়ের টান সময়কেও হারিয়ে দেয়।
বিপুল/২০.০৫.২০২৬/সন্ধ্যা ৬.৫৪