ডেস্কনিউজঃ ফিফা যখন বিশ্বকাপকে ৩২ দল থেকে বাড়িয়ে ৪৮ দলে উন্নীত করেছিল, তখন তাদের আশা ছিল ভারত ও চীনের মতো বিশাল জনসংখ্যার দেশগুলো যাদের মোট জনসংখ্যা প্রায় ২.৭ বিলিয়ন বিশ্বকাপে জায়গা করে নেবে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। বরং ২০২৬ বিশ্বকাপ শুরু হতে এক মাস বাকি থাকলেও এখনো এই দুই দেশে ১০৪টি ম্যাচ সম্প্রচারের কোনো টিভি চুক্তি হয়নি।
কয়েক মাস আগে জানা গিয়েছিল, ফিফা ভারতকে ১০০ মিলিয়ন ডলার এবং চীনকে ২৫০-৩০০ মিলিয়ন ডলারে ২০২৬ ও পরবর্তী বিশ্বকাপের সম্প্রচার স্বত্ব দিতে চেয়েছিল। কিন্তু ক্রমাগত দাম কমানো হলেও এখনো কোনো সমঝোতা হয়নি।
ভারতে সেই মূল্য নেমে এসেছে প্রায় ৩৫ মিলিয়ন ডলারে। সবচেয়ে কাছাকাছি প্রস্তাব দিয়েছে জিওস্টার, প্রায় ২০ মিলিয়ন ডলার। বিষয়টি অবাক করার মতো, কারণ ২০১৪ ও ২০১৮ বিশ্বকাপের জন্য সনি ৯০ মিলিয়ন ডলার দিয়েছিল এবং ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের জন্য ভায়াকম ১৮ দিয়েছিল ৬২ মিলিয়ন ডলার।
ভারতের জন্য এবার ম্যাচের সময়ও খুব সুবিধাজনক নয়। মাত্র ১৪টি ম্যাচ মধ্যরাতের আগে শুরু হবে। ২০১৮ সালে প্রায় সব ম্যাচই রাত ১২টার আগে ছিল, আর ২০২২ সালে মাত্র ২০টি ম্যাচ ছাড়া বাকিগুলোও সুবিধাজনক সময়ে হয়েছিল।
তবে এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনের নির্বাহী কমিটির সদস্য ও ভারতের সাবেক ফুটবল প্রশাসক শাজি প্রভাকরণ মনে করেন, সময়সূচি আসল কারণ নয়। তিনি বলেন, ‘সময়কে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লীগের ম্যাচও প্রায় একই সময়ে হয় এবং ভারতীয়রা সেগুলো দেখে। এটা প্রথম বিশ্বকাপ নয় যা এই সময়ে হচ্ছে।’ তার মতে, মূল সমস্যা হলো ভারতের সম্প্রচার বাজারে প্রতিযোগিতা, অর্থনৈতিক চাপ ও আত্মবিশ্বাসের অভাব। আগে ভায়াকম নতুন প্রতিষ্ঠান হিসেবে দর্শক টানতে বিশ্বকাপের জন্য লোকসান দিতেও রাজি ছিল। এখন বাজারে মূলত দুটি বড় প্রতিষ্ঠান জিওস্টার ও সনি। ভারতের স্পোর্টস ব্রডকাস্টিং বাজারে প্রকৃত প্রতিযোগিতা নেই
আর ক্রিকেটই প্রধান খেলা, তাই সব মনোযোগ সেদিকেই।’ ভারতে ক্রিকেট সবচেয়ে জনপ্রিয় হলেও, চলতি মৌসুমে ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লীগ (আইপিএল)-এর গড় দর্শকসংখ্যা ২৬% কমেছে বলে স্থানীয় প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। ফলে সম্প্রচারকারীরা এখন এমন একটি ফুটবল টুর্নামেন্টে বড় অঙ্কের টাকা খরচ করতে ভয় পাচ্ছে যেখানে ভারত খেলছেই না, আর বেশির ভাগ ম্যাচ গভীর রাতে বা ভোরে অনুষ্ঠিত হবে। ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, পর্তুগাল, জার্মানি ও ইংল্যান্ডের ম্যাচ দর্শক টানবে ঠিকই, কিন্তু গ্রুপ পর্বের অনেক ম্যাচের আকর্ষণ কম। তাছাড়া লিওনেল মেসি ও ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোকে ঘিরে যে বিশাল জনপ্রিয়তা ছিল, সেটিও ধীরে ধীরে কমছে। আরেকটি বড় বিষয় হলো ভারতীয় রুপির অবমূল্যায়ন। ২০১৩ সালে ১ ডলারের মূল্য ছিল ৫৪ রুপি। ২০২২ সালে তা হয় ৭৮ রুপি এবং এখন প্রায় ৯৫ রুপি। চীনের বিষয়টি ফিফার জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ ২০২২ বিশ্বকাপে বৈশ্বিক টিভি দর্শকের ১৭.৭% এসেছিল চীন থেকে, আর ডিজিটাল ও সামাজিক মাধ্যমে সেই হার ছিল প্রায় ৪৯.৮%। চীনের রাষ্ট্রীয় টিভি চ্যানেল সিসিটিভিÑএর বাজেট ছিল মাত্র ৬০-৮০ মিলিয়ন ডলার, যেখানে ফিফা চাইছিল ২৫০-৩০০ মিলিয়ন ডলার। পরে মূল্য কমিয়ে ১২০-১৫০ মিলিয়ন ডলারে নামানো হলেও তা এর নাগালের বাইরে। এ ছাড়া সময়ের পার্থক্যও বড় সমস্যা। বেইজিং নিউ ইয়র্কের থেকে ১২ ঘণ্টা এগিয়ে।
ফলে ম্যাচগুলো চীনে ভোর বা সকালবেলায় হবে, যা বিজ্ঞাপনদাতাদের জন্য কম আকর্ষণীয়। চীনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সিসিটিভিএ’র কম দাম প্রস্তাবের পক্ষে ব্যাপক সমর্থন দেখা গেছে। কারণ অনেক চীনা দর্শক ইন্টারনেটের সীমাবদ্ধতা পাশ কাটিয়ে নিজেরাই খেলা দেখে থাকে। এ ছাড়া অনেকেই বিশ্বাস করেন, শেষ পর্যন্ত একটি চুক্তি হবেই। এজন্য ফিফা ইতিমধ্যে বেইজিংয়ে উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল পাঠিয়েছে।
শাজি প্রভাকরণ মনে করেন, চীনে হয়তো এই সপ্তাহেই চুক্তি হবে, আর ভারতে লাগতে পারে আরও দুই সপ্তাহ।
কিউটিভি/বিপুল/১৩.০৫.২০২৬/রাত ১০.১১