কিশোর বেলার ঈদ উৎসবের আমেজ আর কখনই অনুভূত হয়না। সেই কবে না শৈশবে ঈদের দিনের অপেক্ষায় প্রহর গুনতাম। কবে আসবে ঈদ। ছোটবেলা থেকে রোজা করার অভ্যেস ছিল। রোজা পালনের কঠিন অনুশাসন ছিল এরকম -ঢোক পর্যন্ত গেলা যাবেনা। দুপুরের পর থেকে গলা খটখটে শুষ্ক হয়ে যেত। বুকের ছাতি যেন ফেটে যায়।
সে সময় ঘড়ি খুব কম ছিল। পড়ন্ত বিকেলে মাটিতে রোদের ছাঁয়ায় দাগ দিতাম। একটু একটু করে সে দাগ পশ্চিমে বাড়তে থাকে। আমরা প্রহর গুনতাম ইফতারের সময়ের জন্যে। মাটিতে সূর্যের আলোর প্রক্ষেপন মাপার এই প্রক্রিয়া দেখে বাড়ির লোকজন হাসাহাসি করত। বড় ভাবী বলত, রোজা রাখতে এত কষ্ট হলে রোজা থাকার দরকার নেই।
রোজার মাঝামাঝিতে ঈদের পোশাক বানানোর প্রক্রিয়া শুরু হতো। বাজারে যেয়ে থান কাপড় কিনে দর্জির দোকানে দেয়া হতো। আমরা দর্জির কাছে মাপ দিয়ে আসতাম। দর্জি যেন নির্দিষ্ট সময়ের আগে জামা পাজামা দিতে পারে এজন্যে প্রতিদিন একবার করে দর্জির দোকানে যেয়ে তাগাদা দিয়ে আসতাম।
অবশেষে একদিন ঈদ এসে দরজায় কড়া নাড়তো। ইফতারের আগের মুহূর্তে আকাশে চাঁদ আবিষ্কারের নেশায় আমরা মেঘের ফাঁকে চাঁদ খুঁজতাম।
ঈদের আগের রাত বা চাঁদ রাতে একদঙ্গল কিশোরের মাঠ সাজানোর এক অহর্নিশ প্রতিযোগিতা শুরু হতো। কলা গাছ কেটে ঈদগাহ মাঠের গেট বানানো হতো। সুতলিতে ত্রিভুজাকৃতির রঙিন কাগজ আঠা দিয়ে লাগিয়ে দেয়া হতো। এভাবেই পুরো ঈদগাহ মাঠকে আমরা বর্ণিল রূপ দিতাম।
ঈদের দিনের সকাল বেলায় প্রধান আকর্ষণ ছিল তোপৎধনী। জখড়িয়া পাড়া থেকে লোহার কামান আসতো। কামানে বারুদ ঢুকিয়ে তোপৎধনী দেয়া হতো। বারুদে আগুন দেয়ার আগেই কানে আঙ্গুল চেপে ধরতাম। মাটি কাঁপিয়ে বিকট আওয়াজে সারা গ্রাম কেঁপে উঠত।
ঈদের পোশাক পরে মাথায় দিতাম কাগজের টুপি। সস্তার পুরান নিউজপেপারে রং লাগিয়ে টুপি বানানো হতো। ঈদের আগের দিন সে কাগজের টুপি কিনে এনে আমাদের দেয়া হতো। রাজমুকুটের ন্যায় সে টুপি পড়ে আমরা ঈদগাহ মাঠে যেতাম। এই টুপি ওয়ান টাইম ইউজড হতো।
ঈদ আসে ঈদ যায়। কিশোর বেলার সেই ঈদ আর আসেনা। সেই ঈদের আমেজও আর খুঁজে পাইনা। তারপরেও ঈদের শুভেচ্ছা সকলকে। ঈদ মুবারক।
পাঞ্জাবি : প্রিয় ছোটভাই সাইদুর আর মোহাইমেন লাল পাঞ্জাবিটা গিফট করেছে। আরেক ছোটভাই আশরাফ ঘিয়ে রংগের পাঞ্জাবিটা দিয়েছে। ঈদের দিনে ওদের পাঞ্জাবিই পড়েছি।
লেখকঃ লুৎফর রহমান একজন রাজনীতিবিদ ও লেখক। তিনি নিয়মিত লেখালেখির পাশাপাশি ইলেক্ট্রনিক নিউজ মিডিয়ার সম্পাদক ও প্রকাশক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র লুৎফর রহমান ৮০ এর দশকের স্বৈরাচার বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাস তুলে ধরতে চারটি রাজনৈতিক উপন্যাস লিখেছেন, যা দেশ বিদেশে ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় জীবনের খন্ডচিত্র এঁকে তিনি এখন ব্যাপক পরিচিত পাঠক মহলে। গঠনমূলক ও ইতিবাচক লেখনীতে তিনি এক নতুন মাত্রা সংযোজন করতে সক্ষম হয়েছেন।
বিপুল /২৫/০৩/২০২৬/দুপুর ২.৫৫